চিকিৎসাগত পর্যালোচনা: ডা. অর্ণব কুণ্ডু, MBBS, DGO, DNB (Obstetrics & Gynaecology) — বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ, আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট, রিনিউ হেলথকেয়ার, কলকাতা
সর্বশেষ আপডেট: আগস্ট ২০২৬
সংক্ষেপে: হয় — এবং বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়। পিসিওএস বন্ধ্যাত্বের সবচেয়ে চিকিৎসাযোগ্য কারণগুলির একটি। সমস্যাটা ডিম না-থাকার নয় — ডিম আছে, প্রায়ই যথেষ্টই আছে; সেগুলি নিয়মিত বেরোচ্ছে না (ডিম্বস্ফোটন হচ্ছে না)। আর ডিম্বস্ফোটন ফিরিয়ে আনার ওষুধ আধুনিক চিকিৎসায় ভালোভাবেই আছে।
প্রথমে ভয়টা নামিয়ে রাখুন
রিপোর্টে “পিসিওএস” লেখা দেখে বহু মেয়ে প্রথম যে-প্রশ্নটা খোঁজেন, সেটাই এই লেখার শিরোনাম। উত্তরটা আবার লিখছি, কারণ এটাই সবচেয়ে জরুরি বাক্য:
পিসিওএস মানে মা হতে না পারা নয়। পিসিওএস-আক্রান্ত অধিকাংশ নারীই সন্তানের মা হন — কেউ নিজে থেকেই, কেউ সামান্য চিকিৎসায়, কেউ একটু বেশি চিকিৎসায়।
“সিস্ট” শব্দটাই একটা ভুল বোঝাবুঝি
আলট্রাসাউন্ডে যা দেখা যায়, তা আসলে টিউমার-জাতীয় সিস্ট নয় — সেগুলি ছোট ছোট অপরিণত ফলিকল, প্রতিটি ডিম্বাশয়ে যা এমনিতেই থাকে। পিসিওএস-এ সেগুলি বড় হয়ে ডিম ছাড়ার বদলে আটকে থাকে। এগুলি কেটে বাদ দেওয়ার কিছু নেই, অপারেশনেরও দরকার নেই।
আসল ঘটনাটা হরমোনের। অনেকের শরীরে ইনসুলিন ঠিকমতো কাজ করে না (ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স); শরীর বাড়তি ইনসুলিন বানায়, তাতে ডিম্বাশয়ে পুরুষ-হরমোন বাড়ে — ফল: অনিয়মিত মাসিক, মুখে-শরীরে বাড়তি লোম, ব্রণ, ওজন বাড়া, আর অনিয়মিত ডিম্বস্ফোটন।
এই কারণেই বিশ্বজুড়ে বিশেষজ্ঞরা ২০২৬ সালে রোগটির নামই বদলে পিএমওএস (PMOS) রেখেছেন — যাতে বোঝা যায় এটি “সিস্টের” রোগ নয়, হরমোন ও বিপাকের (মেটাবলিজমের) রোগ। নাম বদলালেও আপনার রোগ, পরীক্ষা বা চিকিৎসা — কিছুই বদলায়নি।
তাহলে বাচ্চা হতে দেরি হয় কেন?
গর্ভধারণের জন্য প্রতি মাসে একটি ডিম বেরোনো চাই। পিসিওএস-এ ডিম্বস্ফোটন হয় অনিয়মিত — কোনও মাসে হয়, কোনও মাসে হয় না। তাই সুযোগ কমে, সময় বেশি লাগে।
লক্ষ করুন — সমস্যাটা সুযোগের, ক্ষমতার নয়। আর এখানেই সুখবর: ডিম্বস্ফোটন নিয়মিত করার চিকিৎসা তুলনামূলক সহজ ও কার্যকর।
চিকিৎসার সিঁড়ি: ধাপে ধাপে
১. জীবনযাত্রা — প্রথম ও প্রমাণিত ধাপ। ওজন বেশি থাকলে মাত্র ৫-১০% কমালেই বহু ক্ষেত্রে মাসিক ও ডিম্বস্ফোটন নিজে থেকেই ফিরে আসে। হাঁটা, ভাত-মিষ্টি-ভাজায় রাশ, ঘুম ঠিক করা — এগুলি “উপদেশ” নয়, রীতিমতো চিকিৎসা।
২. ডিম্বস্ফোটনের ট্যাবলেট। বর্তমান আন্তর্জাতিক নির্দেশিকায় প্রথম পছন্দ লেট্রোজোল — গবেষণায় পুরনো ওষুধের (ক্লোমিফেন) চেয়ে ভালো ফল দেখা গেছে। সঙ্গে প্রয়োজনভেদে মেটফরমিন।
৩. ইনজেকশন বা IUI — ট্যাবলেটে কাজ না হলে।
৪. আইভিএফ — উপরের ধাপগুলি ব্যর্থ হলে বা অন্য কারণ (যেমন টিউব বন্ধ, শুক্রাণুর সমস্যা) যুক্ত থাকলে। মনে রাখবেন, বেশিরভাগ পিসিওএস-রোগীর আইভিএফ পর্যন্ত যেতেই হয় না।
একটি জরুরি সতর্কতা: পিসিওএস-এ ডিম্বাশয় ওষুধে খুব জোরে সাড়া দেয়, তাই আইভিএফ করলে ওএইচএসএস (ডিম্বাশয় ফুলে যাওয়া) ঠেকানোর ব্যবস্থা ক্লিনিকের থাকা চাই। আপনার ক্লিনিককে সরাসরি জিজ্ঞেস করুন — “ওএইচএসএস ঠেকাতে আপনারা কী করেন?”
শুধু বাচ্চা নয় — নিজের জন্যও চিকিৎসা নিন
পিসিওএস সন্তান হওয়ার পরে ফুরিয়ে যায় না। এর সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদে টাইপ-২ ডায়াবেটিস, রক্তচাপ ও কোলেস্টেরলের ঝুঁকি জড়িত। তাই বছরে একবার সুগার-লিপিড পরীক্ষা করানো উচিত — বাচ্চার পরিকল্পনা থাকুক বা না-থাকুক। যে চিকিৎসা শুধু মাসিক নিয়মিত করেই থেমে যায়, সেটি অসম্পূর্ণ চিকিৎসা।
সচরাচর প্রশ্ন
পিসিওএস আর পিসিওডি কি আলাদা?
মূলত একই অবস্থার দুটি নাম হিসেবেই কথ্য ভাষায় চলে; চিকিৎসাবিজ্ঞানে গ্রহণযোগ্য নাম পিসিওএস (নতুন নাম পিএমওএস)। নাম নিয়ে বিভ্রান্ত না হয়ে রোগ নির্ণয় ঠিক আছে কি না, সেটাই জরুরি।
ওষুধ ছাড়া, নিজে থেকে কি মা হওয়া সম্ভব?
সম্ভব — বিশেষত ওজন নিয়ন্ত্রণে এলে অনেকের ডিম্বস্ফোটন নিজেই ফিরে আসে। তবে বয়স ৩০ পেরোলে শুধু অপেক্ষায় বছর না কাটিয়ে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়ে এগোনোই বুদ্ধিমানের কাজ।
রোগা মানুষেরও কি পিসিওএস হয়?
হয়। ওজন স্বাভাবিক থাকলেও পিসিওএস ও ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স থাকতে পারে — দক্ষিণ এশীয়দের ক্ষেত্রে এটি বিশেষভাবে সত্যি। “ওজন তো ঠিকই আছে” বলে সুগার পরীক্ষা বাদ দেবেন না।
সিস্ট গলানোর বা “জরায়ু পরিষ্কারের” ওষুধ লাগবে না?
না। ওগুলি আসলে সিস্টই নয়, অপরিণত ফলিকল — গলানোর কিছু নেই। এই ধরনের কথায় টাকা খরচ করবেন না; চিকিৎসা হয় হরমোন ও ডিম্বস্ফোটনের, “পরিষ্কারের” নয়।
পিসিওএস কি সেরে যায়?
এটি দীর্ঘমেয়াদি অবস্থা — “সেরে যাওয়া” নয়, “নিয়ন্ত্রণে রাখা”ই লক্ষ্য। সুখবর হলো, নিয়ন্ত্রণে থাকলে সন্তানধারণ থেকে দৈনন্দিন জীবন — সবই স্বাভাবিক চলে।
শেষ কথা
পিসিওএস মানে বন্ধ দরজা নয় — একটু ঘুরপথ মাত্র। ডিম আছে; তাকে নিয়মমতো বের করে আনাই চিকিৎসার কাজ, এবং সে-কাজে আধুনিক চিকিৎসা যথেষ্ট দক্ষ। ভয় না পেয়ে সঠিক বিশেষজ্ঞের কাছে যান (দেখুন: কোন ডাক্তার দেখাতে হয় ও কী কী টেস্ট লাগে), আর চিকিৎসাটা শুধু সন্তানের জন্য নয় — নিজের দীর্ঘ সুস্থতার জন্যও নিন।
পিসিওএস নিয়ে সম্পূর্ণ পরামর্শ নিন
ডা. অর্ণব কুণ্ডু, রিনিউ হেলথকেয়ার, কলকাতা — হরমোন ও বিপাক মিলিয়ে সম্পূর্ণ মূল্যায়ন, প্রমাণভিত্তিক ডিম্বস্ফোটন-চিকিৎসা, প্রয়োজনে ওএইচএসএস-সুরক্ষাসহ আইভিএফ।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট: +91 6292 269 060 | renewhealthcare.in | 18C, Mandeville Gardens, Ballygunge, Gariahat, Kolkata 700019
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্যশিক্ষার জন্য; ব্যক্তিগত চিকিৎসা-পরামর্শের বিকল্প নয়।

