চিকিৎসাগত পর্যালোচনা: ডা. অর্ণব কুণ্ডু, MBBS, DGO, DNB (Obstetrics & Gynaecology) — বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ, আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট, রিনিউ হেলথকেয়ার, কলকাতা
সর্বশেষ আপডেট: আগস্ট ২০২৬
সংক্ষেপে: সত্যি কথাটা হলো — বেশিরভাগ নারীর কাছে এইচএসজি মাসিকের ব্যথার মতো কিছুক্ষণের কামড়ানো ব্যথা; মূল অস্বস্তিটুকু কয়েক মিনিটের। কারও কারও ব্যথা বেশি হয়, বিশেষত টিউব বন্ধ থাকলে। আগে থেকে ব্যথার ওষুধ খাওয়া, সঠিক প্রস্তুতি আর অভিজ্ঞ হাত — এই তিনটিতে অভিজ্ঞতা অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। ভয়ে পরীক্ষাটা পিছিয়ে দেওয়াই সবচেয়ে বড় ভুল।
“একটুও ব্যথা নেই” বললে সেটা মিথ্যে হতো
এই পরীক্ষা নিয়ে ইন্টারনেটে দুই মেরুর কথা পাবেন — কোথাও “কিছুই টের পাবেন না”, কোথাও ভয়ঙ্কর সব অভিজ্ঞতা। দুটোই পুরো ছবি নয়।
সত্যিটা মাঝামাঝি: এটি একটি কয়েক মিনিটের পরীক্ষা, যাতে অধিকাংশ নারী মাসিকের মতো কামড়ানো ব্যথা (ক্র্যাম্প) অনুভব করেন — সাধারণত রং (ডাই) ঢোকানোর সময়টুকুতে সবচেয়ে বেশি, তারপর দ্রুত কমে আসে। কারও লাগে সামান্য, কারও বেশ জোরে। আগে থেকে জানা থাকলে ভয়টা অর্ধেক কমে যায় — সেই জন্যই এই লেখা।
এইচএসজি আসলে কী, আর কেন এত জরুরি
এইচএসজি (হিস্টেরোসালপিঙ্গোগ্রাফি) হলো এক্স-রে-র সাহায্যে জরায়ু ও ফ্যালোপিয়ান টিউব খোলা আছে কি না দেখার পরীক্ষা। জরায়ুমুখ দিয়ে সামান্য রং ঢুকিয়ে দেখা হয় তা টিউব বেয়ে বেরোচ্ছে কি না। পদ্ধতিটির বিস্তারিত বর্ণনা আছে আমাদের ইংরেজি লেখাটিতে।
কেন বাদ দেওয়া যায় না? কারণ টিউব বন্ধ থাকলে চিকিৎসার পুরো পথটাই আলাদা — বন্ধ টিউবে ওষুধ বা IUI-তে ফল হবে না, দরকার হবে অন্য পরিকল্পনা। অর্থাৎ এই একটি পরীক্ষার উত্তরের ওপর নির্ভর করছে আপনার সময় ও টাকার সঠিক ব্যবহার। আর টিউবের সমস্যার সাধারণত কোনও লক্ষণই থাকে না — না দেখলে জানার উপায় নেই।
বাড়তি একটি তথ্য: কিছু ক্ষেত্রে (বিশেষত তেল-জাতীয় রং ব্যবহারে) এইচএসজি-র পরের কয়েক মাসে স্বাভাবিক গর্ভধারণের হার কিছুটা বাড়তে দেখা গেছে — একে চিকিৎসা বলা যায় না, তবে পরীক্ষাটি “শুধুই কষ্ট” নয়, এটুকু ভরসা রাখতে পারেন।
ব্যথা কার বেশি, কার কম?
- টিউব খোলা থাকলে ব্যথা সাধারণত কম ও ক্ষণস্থায়ী
- টিউব বন্ধ থাকলে রং বাধা পায় — চাপ ও ব্যথা বেশি লাগতে পারে
- আগে থেকেই মাসিকে খুব ব্যথা যাঁদের, তাঁদের অস্বস্তি একটু বেশি হতে পারে
- ভয়-উদ্বেগ ব্যথা বাড়ায় — এটি প্রমাণিত; তাই আগে থেকে জানাই প্রস্তুতির অর্ধেক
ব্যথা কমানোর ৭টি বাস্তব উপায়
- পরীক্ষার ৩০-৬০ মিনিট আগে ব্যথার ওষুধ খান — কোনটি, তা ডাক্তারই বলে দেবেন; নিজে থেকে নয়।
- অভিজ্ঞ কেন্দ্র বাছুন — যেখানে নিয়মিত এইচএসজি হয়; হাতের দক্ষতায় সত্যিই ফারাক হয়।
- সময় বুঝে অ্যাপয়েন্টমেন্ট — মাসিক শেষের পরের সপ্তাহে করা হয়; ক্লিনিকই দিন ঠিক করে দেবে।
- আসার আগে হালকা খাবার খেয়ে আসুন — খালি পেটে মাথা ঘোরার প্রবণতা বাড়ে।
- পরীক্ষার সময় ধীরে, লম্বা শ্বাস নিন; পেটের পেশি আলগা রাখার চেষ্টা করুন।
- সঙ্গে কাউকে আনুন — ফেরার পথে গাড়ি চালানো বা একা ফেরার ধকল না নেওয়াই ভালো।
- ভয় খুব বেশি হলে ডাক্তারকে আগেই বলুন — বিকল্প ব্যবস্থা বা বিকল্প পরীক্ষা নিয়ে আলোচনা করা যায়।
পরীক্ষার পরে কী হয়?
দু-এক দিন হালকা কামড়ানো ব্যথা ও সামান্য দাগ-রক্ত (স্পটিং) স্বাভাবিক — প্যাড ব্যবহার করুন। বেশিরভাগ নারী সেদিনই স্বাভাবিক কাজকর্মে ফিরতে পারেন।
তবে জ্বর, দুর্গন্ধযুক্ত স্রাব, বা ক্রমশ বাড়তে থাকা ব্যথা হলে দেরি না করে ক্লিনিকে জানান — সংক্রমণ বিরল, কিন্তু অবহেলার জিনিস নয়।
এইচএসজি-র বিকল্প আছে কি?
আছে — সোনোসালপিঙ্গোগ্রাফি (SSG/সোনো-এইচএসজি), যেখানে এক্স-রে-র বদলে আলট্রাসাউন্ড ও স্যালাইন ব্যবহার হয়। এক্স-রে লাগে না, অনেকের মতে অস্বস্তিও কিছুটা কম। কোনটি আপনার জন্য সঠিক, তা নির্ভর করে আপনার ইতিহাস ও ক্লিনিকের ব্যবস্থার ওপর — দুটোর সুবিধা-অসুবিধা নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলুন।
সচরাচর প্রশ্ন
পরীক্ষায় মোট কতক্ষণ লাগে?
মূল পরীক্ষাটি সাধারণত ১০-১৫ মিনিটের; এর মধ্যে অস্বস্তির অংশটুকু কয়েক মিনিট। প্রস্তুতি ও অপেক্ষা মিলিয়ে ক্লিনিকে ঘণ্টাখানেক ধরে রাখুন।
অজ্ঞান (অ্যানেস্থেশিয়া) করে করা যায় না?
সাধারণত দরকারই হয় না। তবে অতীতে খুব কষ্টকর অভিজ্ঞতা থাকলে বা উদ্বেগ খুব বেশি হলে বিকল্প নিয়ে ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলুন — চেপে রেখে কষ্ট পাওয়ার কিছু নেই।
এইচএসজি-র পরে কি টিউব “খুলে যায়”?
এইচএসজি রোগ নির্ণয়ের পরীক্ষা, টিউব খোলার চিকিৎসা নয়। তবে পরীক্ষার পরের কয়েক মাসে কারও কারও গর্ভধারণের সম্ভাবনা কিছুটা বাড়তে দেখা যায় — একে বাড়তি পাওনা হিসেবেই দেখুন।
পরীক্ষার মাসেই কি চেষ্টা করা যাবে?
বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হ্যাঁ, তবে আপনার ক্ষেত্রে কী নিয়ম, তা রিপোর্ট দেখে ডাক্তারই বলবেন।
রিপোর্টে টিউব বন্ধ এলে কি সব শেষ?
একেবারেই না। এক টিউব খোলা থাকলে স্বাভাবিক সম্ভাবনাও থাকে; দুটো বন্ধ থাকলেও আইভিএফ টিউবকে পাশ কাটিয়েই কাজ করে। রিপোর্ট যা-ই হোক, পরের ধাপ আছে।
শেষ কথা
এইচএসজি নিয়ে ভয়টা পরীক্ষার চেয়ে বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে — আর সেই ভয়ে বহু দম্পতি মাসের পর মাস এই জরুরি উত্তরটা না জেনেই ঘুরছেন। প্রস্তুতি নিন, ব্যথার ওষুধ নিয়ে যান, অভিজ্ঞ কেন্দ্রে করান — কয়েক মিনিটের অস্বস্তির বিনিময়ে যে উত্তরটা পাবেন, আপনার চিকিৎসার পুরো পথ সেটাই ঠিক করে দেবে। আর কোন কোন পরীক্ষা লাগে তার পূর্ণ তালিকা দেখুন এই লেখায়।
নিশ্চিন্তে পরীক্ষা করান
ডা. অর্ণব কুণ্ডু, রিনিউ হেলথকেয়ার, কলকাতা — আগে থেকে সব বুঝিয়ে বলা, ব্যথা কমানোর ব্যবস্থা, বাংলায় পরামর্শ।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট: +91 6292 269 060 | renewhealthcare.in | 18C, Mandeville Gardens, Ballygunge, Gariahat, Kolkata 700019
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্যশিক্ষার জন্য; ব্যক্তিগত চিকিৎসা-পরামর্শের বিকল্প নয়।

