চিকিৎসাগত পর্যালোচনা: ডা. অর্ণব কুণ্ডু, MBBS, DGO, DNB (Obstetrics & Gynaecology) — বন্ধ্যাত্ব বিশেষজ্ঞ, আইভিএফ বিশেষজ্ঞ ও স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ, অ্যাসোসিয়েট কনসালট্যান্ট, রিনিউ হেলথকেয়ার, কলকাতা
সর্বশেষ আপডেট: আগস্ট ২০২৬
সংক্ষেপে: সন্তান না হওয়ার প্রায় ৫০% ক্ষেত্রে পুরুষের দিকেও কারণ থাকে, প্রায় ২০-৩০% ক্ষেত্রে কারণটি শুধুই পুরুষের। অথচ আমাদের সমাজে প্রথম আঙুল ওঠে স্ত্রীর দিকে। “দায়ী কে” প্রশ্নটাই আসলে ভুল প্রশ্ন — সঠিক প্রশ্ন হলো, “কারণটা কী, আর তার চিকিৎসা কী?” কারণ খুঁজতে দুজনের পরীক্ষা লাগে, দোষী খুঁজতে নয়।
যে প্রশ্নের পেছনে লুকিয়ে থাকে কান্না
এই প্রশ্নটি যিনি লিখে খোঁজেন, তিনি সাধারণত পরিসংখ্যান জানতে চাইছেন না। তিনি হয়তো সেই স্ত্রী, যাঁকে শাশুড়ি-ননদের কথা শুনতে হচ্ছে রোজ। কিংবা সেই স্বামী, যিনি ভেতরে ভেতরে ভয় পাচ্ছেন — দোষটা তাঁর নয় তো?
তাই উত্তরটা দুই ভাগে দেওয়া দরকার। প্রথমে বিজ্ঞান, তারপর সমাজ।
বিজ্ঞান কী বলে: কারণ কার দিকে, কতটা
আন্তর্জাতিক গবেষণার মোটামুটি সর্বসম্মত চিত্রটি এই:
| কারণ যাঁর দিকে | আনুমানিক অনুপাত |
|---|---|
| শুধু স্ত্রীর দিকে | প্রায় এক-তৃতীয়াংশ |
| শুধু স্বামীর দিকে | প্রায় ২০-৩০% |
| দুজনের দিকেই | একটি বড় অংশ |
| কারণ ধরা পড়ে না | কিছু ক্ষেত্রে |
সব মিলিয়ে পুরুষের দিকে কারণ জড়িত প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রে। অর্থাৎ কোনও পরীক্ষা ছাড়াই স্ত্রীকে দায়ী ধরে নেওয়া মানে — মুদ্রা না ছুড়েই ফলাফল ঘোষণা করা।
আরেকটি কথা স্পষ্ট বলা দরকার: সন্তানের ছেলে-মেয়ে হওয়া নির্ধারণ করে পুরুষের ক্রোমোজোম (X বা Y) — স্ত্রীর নয়। “ছেলে দিতে পারল না” বলে যাঁকে কথা শোনানো হয়, বিজ্ঞানের হিসেবে সে দায় তাঁর নয়, কোনওদিন ছিলও না।
তাহলে আঙুলটা স্ত্রীর দিকেই ওঠে কেন?
কারণগুলি চিকিৎসাবিজ্ঞানের নয়, সমাজের।
গর্ভ স্ত্রীর, তাই দায়ও স্ত্রীর — এই পুরনো ধারণা। গর্ভধারণ শরীরে দেখা যায় স্ত্রীর, তাই না-হওয়াটাও তাঁরই “ব্যর্থতা” ধরে নেওয়া হয়।
পুরুষের পরীক্ষাকে পৌরুষের পরীক্ষা ভাবা। সিমেন টেস্ট দিতে বলা মানেই যেন পুরুষত্ব নিয়ে প্রশ্ন — এই ভয়ে বহু পুরুষ পরীক্ষাই করান না। অথচ শুক্রাণুর সংখ্যা আর পুরুষত্ব, যৌনক্ষমতা বা শারীরিক শক্তি — এগুলি সম্পূর্ণ আলাদা বিষয়। সম্পূর্ণ সুস্থ, সক্ষম পুরুষেরও শুক্রাণু কম থাকতে পারে; তিনি নিজেও তা টের পান না।
তথ্যের অভাব। শাশুড়ি-প্রতিবেশীদের প্রজন্ম এই পরিসংখ্যান জেনে বড় হননি। তাঁদের দোষ দেওয়ার আগে তথ্যটা পৌঁছে দেওয়াও আমাদের কাজ।
দোষারোপের আসল ক্ষতি তিনটি
- রোগ নির্ণয় পিছিয়ে যায়। স্ত্রীর পরীক্ষা চলে বছরভর, স্বামীর সহজতম টেস্টটাই হয় না — অর্ধেক সম্ভাব্য কারণ অদেখাই থেকে যায়।
- সম্পর্ক ভাঙে। দোষারোপ যে ঘরে ঢোকে, সে ঘরে চিকিৎসার সিদ্ধান্ত একসঙ্গে হয় না।
- মানসিক স্বাস্থ্য ভাঙে। দিনের পর দিন “তোমার জন্যই” শুনতে থাকা মানুষটির কষ্ট চিকিৎসাকেও কঠিন করে তোলে। এই কষ্ট পেলে তা লুকোবেন না — ডাক্তারকে বলুন; কাউন্সেলিং এই চিকিৎসারই অংশ।
পরিবারকে কী বলবেন: তিনটি বাক্য
কথা শোনানো আত্মীয়দের জন্য গুছিয়ে রাখুন এই তিনটি উত্তর:
- “ডাক্তার বলেছেন এটা দুজনের বিষয় — আমরা দুজনেই পরীক্ষা করাচ্ছি।”
- “প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রে কারণ থাকে স্বামীর দিকেও — এটা এখনকার চিকিৎসাবিজ্ঞানের হিসাব।”
- “চিকিৎসা চলছে; এ নিয়ে আমরা ডাক্তারের সঙ্গেই কথা বলছি।”
তৃতীয় বাক্যটি সবচেয়ে কাজের — আলোচনাটা সেখানেই শেষ করা যায়।
আর স্বামীদের প্রতি একটি সরাসরি কথা: আপনার স্ত্রীকে আপনার মায়ের সামনে রক্ষা করার দায়িত্বটা আপনার। “মা, ডাক্তার বলেছেন আগে আমার পরীক্ষা দরকার” — এই একটি বাক্য বহু সংসারে বহু কান্না থামিয়ে দিতে পারে।
সচরাচর প্রশ্ন
সত্যিই কি পুরুষের কারণে বাচ্চা না হওয়া এত সাধারণ?
হ্যাঁ। বিশ্বজুড়ে গবেষণার হিসাবে প্রায় অর্ধেক ক্ষেত্রে পুরুষের দিকের কারণ জড়িত। এবং তা ধরা পড়ে একটি সহজ, ব্যথাহীন পরীক্ষায়।
স্বামী সুস্থ-সবল, তাহলে তাঁর সমস্যা কী করে হয়?
শুক্রাণুর সংখ্যা বা মানের সঙ্গে বাইরের স্বাস্থ্য, চেহারা বা যৌনক্ষমতার সম্পর্ক নেই। রিপোর্ট না দেখে কারও দিক থেকেই নিশ্চিত হওয়া যায় না — এই কথাটি দুজনের জন্যই সত্যি।
ছেলে না হলে কি স্ত্রী দায়ী?
না — বিজ্ঞানের হিসাবে সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারিত হয় পুরুষের ক্রোমোজোমে। আর মনে রাখবেন, ভারতে গর্ভস্থ সন্তানের লিঙ্গ পরীক্ষা বা বাছাই করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ।
দুজনের রিপোর্টই স্বাভাবিক — তাহলে দায়ী কে?
কেউ না। একে বলে আনএক্সপ্লেইনড ইনফার্টিলিটি, এবং এরও কার্যকর চিকিৎসা আছে। কারণ অজানা থাকা আর কারও দোষ থাকা এক জিনিস নয়।
শেষ কথা
“দায়ী কে” — এই প্রশ্নের বৈজ্ঞানিক উত্তর: প্রায় সমান সম্ভাবনায় যে-কেউ, প্রায়ই দুজনে মিলে, আর মাঝে মাঝে কেউই না। কিন্তু গভীর উত্তরটা হলো — প্রশ্নটাই বদলে ফেলুন। দোষী খোঁজা বন্ধ হলে কারণ খোঁজা শুরু হয়, আর কারণ খুঁজলেই মেলে চিকিৎসা। শুরু করুন এখান থেকে: কী কী টেস্ট করতে হয় ও কোন ডাক্তার দেখাতে হয়।
দোষারোপ নয়, সমাধান খুঁজুন
ডা. অর্ণব কুণ্ডু, রিনিউ হেলথকেয়ার, কলকাতা — দুজনের পরীক্ষা, বাংলায় খোলামেলা পরামর্শ, প্রয়োজনে কাউন্সেলিং।
অ্যাপয়েন্টমেন্ট: +91 6292 269 060 | renewhealthcare.in | 18C, Mandeville Gardens, Ballygunge, Gariahat, Kolkata 700019
এই লেখাটি সাধারণ স্বাস্থ্যশিক্ষার জন্য; ব্যক্তিগত চিকিৎসা-পরামর্শের বিকল্প নয়।

